শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৭ অপরাহ্ন
চাঁদা না দেওয়ায় শিক্ষকের উপর গুলি বর্ষণ!
মামুন মোল্লা, খুলনা জেলা প্রতিনিধি
খুলনার আড়ংঘাটা থানাধীন তেলিগাতি এলাকায় বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে যায় এক রোমহর্ষক ও বিভীষিকাময় ঘটনা। তেলিগাতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলীপ কুমার সরকার প্রতিদিনের মতোই সকাল ৮টার দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হেঁটে স্কুলের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু কয়েক কদম চলার পরই তার জীবনের ওপর নেমে আসে অমানিশার মতো এক আক্রমণ। সরদারপাড়া জামে মসজিদের সামনে পৌঁছাতেই হঠাৎ একটি মোটরসাইকেলে আসা দুজন দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে পরপর গুলি চালায়। একটি গুলি সোজা গিয়ে বিদ্ধ হয় তার বাম পায়ের হাঁটুর ওপরে, আর মূহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন দিলীপ কুমার।
চারপাশে গুলির শব্দে ছুটে আসে স্থানীয়রা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা শিক্ষকের পাশে ছুটে এসে স্থানীয়রা প্রথমে তাকে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেন এবং পরে দ্রুত ভর্তি করা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ভাগ্য ভালো বলতে হবে—গুলিটি প্রাণঘাতী স্থানে না লাগায় তিনি আপাতত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন, তবে পায়ে গুরুতর ক্ষত নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনা কোনো হঠাৎকার হামলা নয়, বরং তার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর শত্রুতা ও একাধিক হুমকির ইতিহাস। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিলীপ কুমার সরকারের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। পাশাপাশি সম্প্রতি কয়েকজন সন্ত্রাসী তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। দিলীপ কুমার চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায়, বারবার হুমকি পেতে থাকেন। এসব হুমকি এক সময় বাস্তবে রূপ নেয়।
ঘটনার মাত্র ২০ মিনিট পরই, আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পায়। মনিরুল আলম নামের এক ব্যক্তি, যিনি ডিসি অফিসের অফিস সহায়ক পদে কর্মরত, তার ছেলে মেজাবউল আলমকে সকাল ৯টায় ফোন করে দুর্বৃত্তরা হুমকি দিয়ে বলে—“২০ লক্ষ টাকা না দিলে তোর ভাইকে গুলি করবো।” এই হুমকির ফলে প্রমাণিত হয় যে হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত এবং পেশাদার অপরাধীদের দ্বারা পরিচালিত।
ঘটনার পরপরই আড়ংঘাটা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তুহিনুজ্জামান জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে—এই হামলা পূর্ব শত্রুতা, জমি বিরোধ এবং চাঁদা দাবির জের ধরে সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, “আহত শিক্ষকের অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। আমরা অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছি এবং দ্রুত তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।” তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, এই ঘটনায় সম্পূর্ণ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ঘটনা খুলনা জেলাসহ পুরো দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক তীব্র ধাক্কা দিয়েছে। একজন সম্মানিত শিক্ষক, যিনি আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলছেন, তিনিই যখন দুর্বৃত্তের গুলির নিশানা হন—তখন প্রশ্ন উঠে সমাজের নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে। এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ওপর এক নির্মম আঘাত।